গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সেবা গ্রহীতারা। টাকা আছে-সেবা আছে,টাকা নাই-সেবা নাই এমন অভিযোগ উঠেছে ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
নামজারী জমা খারিজে সরকারি অর্থের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়াসহ অফিসে দালাল পোষে খারিজে দালালের মাধ্যমে ঘূষ বাণিজ্যের সীমাহীন অনিয়ম দুর্ণীতির অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অভিয়োগ উঠেছে অফিসটিতে রীতিমত সহকারী ভূমি কর্মকর্তার কাছে সাধারণ মানুষ এখন জিম্মি। জমির নামজারী খারিজ, খাজনা পরিশোধ থেকে শুরু করে সরকারি জমি বন্দোবস্ত পর্যন্ত প্রতিটি দাপ্তরিক কাজেই ভূমি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সেলিমের বিরুদ্ধে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে নামজারি প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এই দপ্তরে দালালদের মধ্যস্থতা ছাড়া কোনো কাজই এগোয় না। মূলত প্রতিটি ফাইলের ওপর দালালের সাথে চুক্তির বিশেষ ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ না থাকলে সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাতে আবেদনটি বাতিল করে দেন। এতে সাধারণ মানুষ যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইনে আবেদনের পর ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবেদনের হার্ড কপির সাথে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন দালালের মাধ্যমে। নির্ধারিত দালাল না থাকলে ভূমি কর্মকর্তা সরাসরি আবেদনকারীর সাথে চুক্তিতে যান। চুক্তির পর ফাইলের ওপর বিশেষ চিহ্ন দেওয়া হয়, যা দেখে পরবর্তী ধাপের কর্মকর্তারা ফাইলটি অগ্রসর করেন।
অভিযোগ রয়েছে, জালানী সংকট মোকাবেলায় সরকার অফিস টাইম নির্ধারিত করলেও নায়েব সেলিম সরকারের এই নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অফিস টাইম শেষে অতিরিক্ত জ্বালানী ব্যয় করে বিশেষ চিহ্নযুক্ত ফাইলের হিসাব অনুযায়ী ঘুষের টাকা লেনদেন করা হয়। চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে খোদ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সেলিম নিজেই চুক্তিতে লিপ্ত হন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। যারা এই অনৈতিক চুক্তিতে রাজি হন না, তাদের আবেদনগুলো ত্রুটি দেখিয়ে নামঞ্জুর করে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে এই দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ইউনিয়নের কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, নামজারি করাতে তারা কেহ ১০ হাজার আবার কেহ ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন ভূমি কর্মকর্তাকে। অভিযোগ রয়েছে, অফিস টাইমের পর নির্দিষ্ট দালালদের নিয়ে রাত পর্যন্ত এই অবৈধ লেনদেনের হিসাব-নিকাশ করেন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সেলিম।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে এবং অফিসের লোকদের সঙ্গে ঘুষের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ না হয়ে সেবা নিতে গেলে সেবাগ্রহীতাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। এমনকি চাহিদা মতো ঘুষ না দিলে দীর্ঘদিনেও অফিসের টেবিল থেকে নড়ে না ফাইল। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়ছে ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা জনসাধারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী,জানান, “আমি জমির নামজারি করতে সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না।” তার মতো আরও অনেকেই জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নিজেদের সম্পত্তি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন।কেহ কেহ রাগে ক্ষোভে সহকারী ভূমি কর্মকর্তার এই খারিজ বাণিজ্যের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পোস্ট করে ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবী জানিয়েছেন।
ভয়েস অব মঠবাড়ী নামের একটি ফেসবুক আইডিতে পোস্ট অভিযোগ করেন- মঠবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে স্থানীয় হাফিজুল নামে একজন ব্যক্তি রয়েছে যার কোন সরকারি নিয়োগ নেই। সে স্থানীয় আব্দুল খালেকের পুত্র। প্রতিদিন একজন কর্মচারীর মত নিয়মিত ভূমি অফিসে আসেন। হাফিজুলের মাধ্যমে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সেলিম প্রতি খারিজে দশ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। আর জটিলতা অনুযায়ী আরও বেশি অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন পোস্ট দাতা। একজনের ব্যক্তিগত তথ্য অন্যজনের কাছে অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম চলছে এই ভূমি অফিসে। হাফিজুলের বাবা খালেক বাহিরে থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে তার ছেলে হাফিজুল ইসলামের মাধ্যমে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যার ফলে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তার অভিযোগ এতে উঠছে আরও প্রশ্ন: একজন ঝাড়ুদারের আয়ে কীভাবে ২ তলা বাড়ি নির্মাণ সম্ভব হলো? কীভাবে তার ছেলে হাফিজুল ইসলাম দামি ব্রান্ডের মোটরসাইকেল ক্রয় করলো? এসব সম্পদের উৎস কী এ নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবী উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগ উঠেছে-ঘুষের টাকা ছাড়া সেবাগ্রহীতারা আবেদনপত্র জমা দিলে তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি অফিস ঘুষ ও দালাল সিন্ডিকেটের বাহিরে গেলেই আবেদন বাতিল করাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়। অথচ নায়েবের চাহিদা মতো অতিরিক্ত টাকা দিলেই তারা অফিসের ভিতরে গেলেই চোখের পলকে সমস্যা সমাধান হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে, প্রতিটি নামজারী খারিজের নথি পিছে ১০-২০হাজার টাকা নায়েবকে দিতে হয়,প্রতিটি মিস কেইস, ১৪৪সহ বিভিন্ন মামলার প্রতিবেদনে নায়েবকে দিতে হয় ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত । অভিযোগ উঠেছে- নায়েব কামরুজ্জামান সেলিম খাজনার টাকা আদায়ে বেশী বেশী করে নোটিশ ছাড়লেও পরে তাকে টাকা দিলেই খাজনার পরিমাণ কমে যায়,এতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্লেষকরা। ভূমি বিষয়ে কেউ নায়েবের সাথে কেহ পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করে তার সাথে ভূমি বিষয়ে ভালো মন্দ পরামর্শ করতে গেলে নায়েব সেলিম তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সুত্র জানিয়েছে একটি মিউটেশনের সরকারি চার্জ ১১৭০ টাকা হলেও অভিযোগ উঠেছে মঠবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে মিউটেশনে এসিল্যান্ডের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রতিটি ৫হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন ভূমি কর্মকর্তা।
খোজ নিয়ে জানা গেছে- মঠবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মিলছে না কোনো সেবা এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে অনেককেই। জমির নামজারি, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায় প্রতিটি ধাপে টাকা না দিলে কাজ হয় না বলেও জানান তারা।
এব্যাপারে সহকারী ভূমি কর্মকর্তার সাথে তা মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত জানিয়ে পরে কথা বলবে বললেও পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।