গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০। কিন্তু এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় এর পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা, দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া, এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার ঘাটতির জটিল বাস্তবতা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৭ মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৯২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ৭৪ জন। যদিও তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে, তবুও প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি কি আগে থেকেই ছিল।
চিকিৎসকরা বলছেন, অধিকাংশ শিশু হাসপাতালে আসছে গুরুতর অবস্থায়। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই জটিলতা বাড়ছে। দেরিতে হাসপাতালে আসা মৃত্যুর বড় কারণ।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক অভিভাবক প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বা দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। ফলে যখন শিশুদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে, তখন তারা ইতোমধ্যেই নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া বা হার্টজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিজে সবসময় প্রাণঘাতী নয়, কিন্তু জটিলতা তৈরি হলে তা দ্রুত মারাত্মক রূপ নেয়।
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতাও একটি বড় কারণ হতে পারে। অনেক শিশু সময়মতো হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ প্রবণতা বেশি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না মিললেও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা স্বীকার করছেন, সচেতনতার অভাব ও কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। তবে জানা যায়, রোগীর তুলনায় বেড সংখ্যা সীমিত। চিকিৎসক-নার্সদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, “চিকিৎসকরা আন্তরিক, কিন্তু রোগী বেশি হওয়ায় সময় দিতে পারছেন না।
সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করা তিন শিশুর মধ্যে গৌরীপুর উপজেলার ৭ মাস বয়সী এক ছেলে শিশু গতকাল (২৭ এপ্রিল) বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে, জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার ৪ মাস বয়সী এক মেয়ে শিশু একই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে এবং নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার ৫ মাস বয়সী এক ছেলে শিশু রাত ১০টা ৩০ মিনিটে মারা যায়।
মারা যাওয়া তিন শিশুর বয়স ৪ থেকে ৭ মাস। এত কম বয়সী শিশুদের মৃত্যু ইঙ্গিত দেয়, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, আর সংক্রমণ দ্রুত জটিল হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বয়সী শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, গ্রাম পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা বাড়ানো,অন্যথায়, এই প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের এই চিত্র কেবল একটি হাসপাতালের সংকট নয়; এটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সতর্ক সংকেত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে—আর সেই তালিকায় যুক্ত হবে আরও নিরীহ শিশুর নাম।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় স্থাপিত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।