
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বকশীগঞ্জ বাজারে ‘নিউ মাতৃ জুয়েলার্স’ নামে একটি স্বর্ণের দোকান জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া এবং দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি পক্ষের বিরুদ্ধে। দোকানের মালিকের অনুপস্থিতিতে কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে দোকান থেকে বের করে দিয়ে জোরপূর্বক তালা লাগানোর ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সংখ্যালঘু দম্পতি উৎপল মহন্ত ও তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি সুমি মহন্ত ২০১২ সালে ২৬ পয়েন্ট জমি সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে ক্রয় করে ওই জমিতে ‘নিউ মাতৃ জুয়েলার্স’ নামে স্বর্ণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। দীর্ঘদিন ধরে ওই দোকানটি তাঁদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল।
দোকানের মালিকের অভিযোগ, ২০১৩ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে স্থানীয় শেখ ফরিদ মিয়া ও তাঁর সহযোগীরা দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। দাবিকৃত চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান ও দোকানের ভূমি দখলের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়। তবে সে সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তৎকালীন বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ তালুকদার, তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিজয়, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার হয়। পরে লিখিতভাবে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন দোকানের মালিকপক্ষ।
তবে সম্প্রতি আবারও দোকান ও জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দোকান মালিকপক্ষের দাবি, শেখ ফরিদ মিয়া পুনরায় পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় গত ১০ আগস্ট ২০২৬ উৎপল মহন্তের অনুপস্থিতির সুযোগে শেখ ফরিদ মিয়া ও তাঁর সহযোগীরা দোকানে গিয়ে কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে বের করে দেন। পরে তাঁরা জোরপূর্বক দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে গত ১৪ আগস্ট। দোকান মালিকপক্ষের দাবি, ওই দিন ভোরে ‘নিউ মাতৃ জুয়েলার্স’-এর সাইনবোর্ড রং দিয়ে ঢেকে সেখানে ‘এই দোকান ভাড়া দেওয়া হবে’ লিখে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দোকান ভাড়া দেওয়ার জন্য একটি মোবাইল নম্বরও সেখানে লিখে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
দোকান মালিকপক্ষের দাবি, দোকানঘরসহ সংশ্লিষ্ট ভূমি বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক, বকশীগঞ্জ শাখায় বন্ধকীকৃত সম্পত্তি। ফলে এভাবে জোরপূর্বক দোকান দখল ও ভাড়া দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার ঘটনায় তাঁরা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এদিকে, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দেনদরবারের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি বলে জানা গেছে। পরে গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ জমির যৌথ মালিক ও উৎপল মহন্তের স্ত্রী শ্রীমতি সুমি মহন্ত বকশীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগকারীর দাবি, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত সেটি মামলা বা এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়নি। বরং বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মকবুল হোসেন স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সুমি মহন্ত।
দোকান মালিকপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিবারের আয়-রোজগারের প্রধান পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে দোকান ও জমি নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু পরিবার হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলেন, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শেখ ফরিদ মিয়া ও তাঁর সহযোগীদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে, দোকান মালিকপক্ষ প্রশাসনের কাছে তাঁদের সম্পত্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উদ্ধারের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে লিখিত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।