গ্যাসসংকটে ২৬ দিন ধরে উৎপাদন শূন্য, বিভাগজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং
স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ:
গ্যাসের তীব্র সংকটে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে অবস্থিত রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন টানা ২৬ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। একই সময়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আরও দুটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রও গ্যাসের স্বল্পতার কারণে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে।
আরপিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শম্ভুগঞ্জে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। কেন্দ্রটি স্থাপনের পর বিভিন্ন সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে এর উৎপাদন সক্ষমতা কমতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছিল না।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবহার—দুই-ই কমেছে।
বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় গত ২৬ দিন ধরে কেন্দ্রটির উৎপাদন শূন্যে নেমে এসেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে ময়মনসিংহ অঞ্চলের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে না।
ময়মনসিংহ আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, গ্যাসসংকটের কারণেই ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২৬ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে কেন্দ্রটিতে পুনরায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়কার নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বলে দেশের একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শুধু আরপিসিএলের ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটিই নয়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের আরও দুটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রও গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
ফলে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়।
বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ময়মনসিংহের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কয়েক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ ফিরে আসছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের ভ্যানচালক নাসির উদ্দিন বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তিন থেকে চার ঘণ্টার আগে অনেক সময় ফিরে আসে না। রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সন্তানদের পড়াশোনাতেও সমস্যা হচ্ছে।
শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, ময়মনসিংহ নগরীতেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নগরের কাঁচিঝুলি এলাকার নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার বলেন, দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের কাজের পাশাপাশি তাঁর উদ্যোক্তা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুতের পাশাপাশি বাসাবাড়িতে গ্যাসসংকট থাকায় রান্নাবান্নাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ফলে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস—দুই ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে ময়মনসিংহের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সামনে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
ময়মনসিংহের বাসিন্দাদের দাবি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে না দেখে এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে ২১০ মেগাওয়াটের আরপিসিএল কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি গ্যাসের অভাবে দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তাহলে এত বড় বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষ কীভাবে পাবে?
ময়মনসিংহে গ্যাস সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে এবং শম্ভুগঞ্জের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কবে আবার উৎপাদনে ফিরবে—এখন সেটিই স্থানীয় মানুষের প্রধান উদ্বেগ। দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা না গেলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।