সাইফুল ইসলাম তরফদার ময়মনসিংহ:
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ৯ নং এনায়েতপুর ইউনিয়নের বেতবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম ওরফে ‘চানু মাস্টার’ এর বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া, টাকা ফেরত না দেওয়া এবং বিদ্যালয় পরিচালনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চাকরির আশায় অর্থ দিয়ে এখন সর্বস্ব হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৬ বছর আগে বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় লাল মিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। ওই অর্থের জোগান দিতে লাল মিয়া নিজের ৯ কাঠা জমি বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কথিত সেই চাকরি না হওয়ায় অর্থ ফেরতের জন্য প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের কাছে বারবার ধরনা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।
লাল মিয়ার অভিযোগ, চাকরি দেওয়ার কথা বলে জমি বিক্রি করে তিনি টাকা দিয়েছেন। চাকরি পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও তিনি কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি। এখন তিনি আর্থিকভাবে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এবং দিনমজুর হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এক সময় চাকরির আশায় নিজের সম্পদ বিক্রি করা লাল মিয়া বর্তমানে অন্যের লেবু বাগানসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকের কাজ করছেন। অভিযোগের বিষয়ে টাকা ফেরতের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের অফিসে ঘোরাঘুরি করলেও কাঙ্খিত সমাধান পাননি।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকা ফেরত চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বিভিন্ন সময় টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেন। কখনো ‘আজ দেব’, আবার কখনো ‘কাল দেব’ এভাবে সময়ক্ষেপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া লাল মিয়া এখন চাকরির দাবি থেকে সরে এসে তার দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
এ বিষয়ে মোঃ ওমর ফারুক মাস্টার বলেন, চাকরি দরকার নেই। সাত দিন সময় দিয়ে গেলাম। আমার ভাই এর টাকা পরিশোধ করেন স্যার।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর এখন তার প্রধান দাবি হলো যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা ফেরত দেওয়া।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ২৬ বছর আগে বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিষয়টির কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও ভুক্তভোগীরা তাদের অর্থ ফেরত পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সময় তারা বিশ্বাস করে অর্থ দিয়েছিলেন। কিন্তু চাকরি না হওয়া এবং অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তারা এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান পদে ৯ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
শুধু নৈশপ্রহরীর চাকরির অভিযোগ নয়, বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলেও ৯ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে ৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা বিষয়টি তদন্ত করে চাকরির নামে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
৯ নং এনায়েতপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্কুলে গিয়ে বলে আসছি। চানু মাস্টার টাকা নিয়েছে সে স্বীকার করছে। একটা সমাধান করবে।
তার দাবি, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা হয়েছে এবং প্রধান শিক্ষককে অভিযোগের সমাধান করার জন্য বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন। অভিযোগকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও চাপ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের পৃথক ও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বৃক্ষরোপণের জন্য প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বিদ্যালয়ে মাত্র দুইটি গাছ রোপণ করা হয়েছে।
এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং বরাদ্দকৃত অর্থের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো গাছ রোপণ করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়, বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হলেও কাঙ্খিত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, পরিবেশ ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব, উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয়ের ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম ওরফে চানু মাস্টারের বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং আওয়ামী লীগপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ তাকে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এবং ওই রাজনৈতিক সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে দাবি করেছেন। তবে তার রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো দলের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রামাণ্য দলিল বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আরোপ করা যায় না।
চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ, দীর্ঘদিনেও টাকা ফেরত না দেওয়া, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান পদে ৯ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং বৃক্ষরোপণসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ সবগুলো বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, বিদ্যালয়ের গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক হিসাব, উন্নয়ন প্রকল্পের নথি, নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অভিযোগকারীদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করা হলে কৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির আশায় নিজের জমি বিক্রি করে অর্থ দেওয়ার পরও দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তিনি চাকরি পাননি। এখন বয়স ও আর্থিক অবস্থার কারণে চাকরির পরিবর্তে নিজের দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়াই তার প্রধান দাবি।
দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালানো লাল মিয়ার মতো একজন মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের সঞ্চয় বা জমি বিক্রির অর্থ হারানোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে প্রশাসনিকভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, সনদ ও ভোটার আইডি কার্ডে নাম গড়মিল। এটি সংশোধন করে এনে দিলেই তার বিল বেতন হয়ে যাবে। কিন্তু সেটি তিনি দিচ্ছেন না। মিনিস্ট্রি অডিটে লাল মিয়ার নাম এসেছে, জরিপেও তার নাম দেওয়া হয়েছে। মূলত পরিচালনা কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব। অন্য কোন পদে কারো কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান ভূয়া বলেন, এ জাতীয় লিখিত কোন অভিযোগ পেলে তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।