গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
সরকারি চাকরি নির্ধারিত কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিচারপ্রার্থী মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই একজন বিচারকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এমন বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা থেকে নিয়মিত অফিস সময়ের বাইরেও মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ সাইফুল ইসলাম। বিচারপ্রার্থীদের বিরোধ দ্রুত, কার্যকর ও স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
‘একজন বিচারকের ডায়রি থেকে’ শিরোনামে নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাইফুল ইসলাম জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে যদি শুধু মাসিক বেতনভোগী কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করে কর্মস্থল ত্যাগ করা সম্ভব। কিন্তু একজন বিচারক যখন নিজেকে জনগণের সেবক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখেন, তখন তার দায়িত্বের পরিধি নির্ধারিত অফিস সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি দেওয়ানি, ফৌজদারি ও পারিবারিক বিরোধের শুনানি কিংবা মধ্যস্থতার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় তাকে। এসব বিরোধের ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং উভয় পক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বিরোধের পেছনে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের নানা সংকট। তাই একটি মামলা বা বিরোধকে কেবল একটি নথি হিসেবে দেখলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিচারপ্রার্থী মানুষের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আইনগত কাঠামোর মধ্যে থেকেই কার্যকর সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হয়।
তিনি জানান, অনেক সময় একটি বিরোধের সুষ্ঠু মীমাংসার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। এমনও দিন গেছে, একটি বিরোধের সমাধানে টানা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়েছে। এমনকি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মীমাংসা সভা পরিচালনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
তার মতে, অফিসের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলেই মানুষের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কোনো একটি বিরোধ যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পর্যায়ে থাকে এবং সামান্য সময় বাড়িয়ে কাজ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই সময়টুকু দেওয়াকেই তিনি দায়িত্বের অংশ হিসেবে মনে করেন।
সাইফুল ইসলাম বলেন, একজন বিচারকের দায়বদ্ধতা শুধু আদালতের চার দেয়ালে বা নির্দিষ্ট অফিস সূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণের সেবা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একজন ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করাই আমার মূল দর্শন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তরিকতা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে সফল বিরোধ মীমাংসাসহ মোট বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সারা বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। তবে এই অর্জনকে তিনি ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দেখেন।
এর আগে নওগাঁয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সর্বোচ্চ মামলা নিষ্পত্তিকারী ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন সাইফুল ইসলাম। তার মতে, বিচারকের কর্মদক্ষতা শুধু কতগুলো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, এ দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়; বরং বিচারপ্রার্থী মানুষ কতটা দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার পেলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, একটি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পরও যদি পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধের মূল কারণ থেকে যায়, তাহলে সামাজিক শান্তি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিশেষ করে পারিবারিক ও দেওয়ানি বিরোধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার মাধ্যমে উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো গেলে দীর্ঘমেয়াদি মামলা-মোকদ্দমা, সময় ও অর্থের অপচয় কমানো সম্ভব।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের বহু বিচারক বিচারপ্রার্থী মানুষের কষ্ট লাঘব এবং দ্রুত ন্যায়বিচার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত সময় দেওয়াকে তিনি কোনো বিশেষ কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন না; বরং বিচারক হিসেবে পেশাগত ও নৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই দেখেন।
তিনি বলেন, বিচারপ্রার্থী একজন মানুষ আদালত বা লিগ্যাল এইড অফিসে আসেন তার সমস্যা ও প্রত্যাশা নিয়ে। সেই প্রত্যাশার জায়গাটিকে সম্মান করা এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকে তার ন্যায়সংগত প্রতিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করাই বিচারকের দায়িত্ব।
তার ভাষায়, আইনের পোশাকের ভেতরে এই মানুষগুলোর হৃদয় যখন জনসেবায় স্পন্দিত হয়, তখনই তৈরি হয় আসল বিচারব্যবস্থা।
ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রমে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি বিচারপ্রার্থীদের বিরোধ মীমাংসা ও আইনগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি মানবিক কর্মসংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে। নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় দিয়ে কাজ করার এই অভ্যাস বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা দেওয়ার প্রচেষ্টারই অংশ বলে মনে করেন তিনি।
সাইফুল ইসলামের মতে, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে হলে বিচারপ্রার্থীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণ এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করা জরুরি। আর এই দায়িত্ব পালনে সময়ের সীমারেখার চেয়ে মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।