
মারুফ হাসান, স্টাফ রিপোর্টার:
সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রত্যয় নিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের পথচলা পূর্ণ করেছে মানবিক ও নারী সংগঠন ‘চেষ্টা’। প্রতিষ্ঠার দেড় দশকের এই গৌরবময় পথচলাকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানী ঢাকার মহাখালী রাওয়া ক্লাবে বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে সংগঠনটির ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সংগঠনের সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও অতিথিদের উপস্থিতিতে রাওয়া ক্লাব পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়। একদিকে ছিল দীর্ঘ পথচলার সাফল্য ও অর্জনের স্মৃতিচারণ, অন্যদিকে ছিল প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্মরণ এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রত্যয়।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য ছিল— “১৫ বছরের পথচলায় মানবিক সেবায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ”। প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানে চেষ্টার ১৫ বছরের বিভিন্ন মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নানা উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চেষ্টার প্রেসিডেন্ট লায়লা নাজনীন হারুন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. নাজনীন আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা খুকু আহমেদ এবং বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা, লেখিকা ও সংগঠক কণা রেজা।
প্রয়াতদের স্মরণে নেমে আসে আবেগের আবহ, অনুষ্ঠানের শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করা হয় চেষ্টার প্রতিষ্ঠাতা লে. জেনারেল হারুন অর রশিদ বীরপ্রতীক, প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা ডা. মো. মিজানুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা ড. মো. হারুন অর রশিদ, সদস্য সামসুন নাহারের স্বামী ডা. ফজলে এলাহী এবং চেষ্টার শুভাকাঙ্ক্ষী তরুণ ব্যবসায়ী সৈয়দ মো. সাঈদকে।
তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকের মধ্যেই আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এছাড়া চেষ্টার সদস্যা ফারজানা আহমেদের স্বামী মোস্তাক আহমেদের দ্রুত রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন সংগঠনের উপদেষ্টা লে. কর্নেল (অব.) কাওসার মাহমুদ।
১৫ বছরের মানবিক পথচলার গল্প স্বাগত বক্তব্যে চেষ্টার সেক্রেটারি গুলশান নাসরীন চৌধুরী সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘চেষ্টা’ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “চেষ্টা শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়, এটি মানবতার সেবায় নিবেদিত একটি পরিবার।”
দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল সংগঠনের দীর্ঘদিনের সদস্য ও সক্রিয় কর্মীদের সম্মাননা প্রদান।
দীর্ঘদিনের অবদান ও সক্রিয় অংশগ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ নিম্মী চৌধুরী, সাহানা পারভীন, লায়লা নাজনীন হারুন, গুলশান নাসরীন চৌধুরী, দিলরুবা মাহমুদ ও সাকেরা খানকে আজীবন সদস্য হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সম্মাননা প্রদানের সময় উপস্থিত অতিথি ও সদস্যরা করতালির মাধ্যমে তাঁদের অভিনন্দন জানান। এ সময় সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহের সৃষ্টি হয়।
সমাজ পরিবর্তনে মানবিক সংগঠনের গুরুত্ব অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন চেষ্টার উপদেষ্টা লে. কর্নেল (অব.) কাওসার মাহমুদ এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল হক। তাঁরা সংগঠনের দীর্ঘদিনের মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বেসরকারি মানবিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জামালপুর থেকে আগত বীরকন্যা রঙ্গমালার কন্যা হেনা বেগম চেষ্টার কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে প্রয়াস ‘চেষ্টা’ চালিয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা, লেখিকা ও সংগঠক কণা রেজা বলেন, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে ‘চেষ্টা’র মতো সংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নারী নেতৃত্ব বিকাশ এবং সমাজে নারীদের মর্যাদা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে বিচার করলে হবে না। একটি সমাজ কতটা মানবিক, সহমর্মী ও দায়িত্বশীল—সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ১৫ বছর ধরে মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তিনি ‘চেষ্টা’র প্রশংসা করেন এবং সংগঠনটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা খুকু আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিকতা ও দেশপ্রেমের চেতনা ছড়িয়ে দিতে সংগঠনটির কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান তিনি।
সামনে আরও বড় পরিসরে কাজের পরিকল্পনা সভাপতির বক্তব্যে লায়লা নাজনীন হারুন চেষ্টার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগামী দিনে সংগঠনের মানবিক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
নারী উন্নয়ন, শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন সফল করতে সহযোগিতাকারী সকল সদস্য, অতিথি, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর অনুষ্ঠান আলোচনা ও সম্মাননা পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চেষ্টার প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সংগঠনের মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের স্মরণে গান, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়।
এতে অংশগ্রহণ করেন সাহানা আহমেদ, কানিজ মাহমুদ, শাহনাজ মান্নান, নিম্মী চৌধুরী, আইভী মামুনসহ সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানস্থলে তৈরি হয় আনন্দঘন ও প্রাণবন্ত পরিবেশ।
মানবতার সেবায় অব্যাহত থাকবে ‘চেষ্টা’।অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে বক্তব্য দেন চেষ্টার ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহানা আহমেদ। তিনি উপস্থিত অতিথি, সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা, উপদেষ্টা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
তিনি বলেন, মানবতার কল্যাণে ‘চেষ্টা’র পথচলা অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষের কাছে মানবিক সেবার হাত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সবশেষে ১৫ বছরের সাফল্য, স্মৃতি, আবেগ ও অর্জনকে সঙ্গে নিয়ে নতুন দিনের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ‘চেষ্টা’। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজন শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানবিকতা, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়কে আরও দৃঢ় করার একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়।
অতিথি, সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা আগামী দিনে ‘চেষ্টা’ তার মানবিক কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও বিস্তৃত করে সমাজের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।