
গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যে ময়মনসিংহে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, স্টেকহোল্ডার ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
কর্মশালায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব তাহমিলুর রহমান। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এ চাহিদা বেড়ে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদা পূরণে এখন থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস ও এলএনজি, যার একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-আমেরিকা সংঘাতসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট এবং হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কারণে জ্বালানি আমদানিতে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়ছে।
তাহমিলুর রহমান বলেন, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে দুই বছর আগের তুলনায় বর্তমানে এলএনজির দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সরকার বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ২২ টাকা ইউনিট দরে বিদ্যুৎ কিনে জনগণের কাছে প্রায় ৪ টাকা ৪৩ পয়সা দরে সরবরাহ করছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের প্রকৃত ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির বিষয়টি সাধারণ মানুষ অনেকাংশে অবগত নন। তাই বিদ্যুৎ খাতের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ সংকট কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সব সময়ের এবং সব সরকারের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দল-মত নির্বিশেষে টেকসই ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
কর্মশালায় সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তাহমিলুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি হচ্ছে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করা। এই লক্ষ্য অর্জনে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা যখন ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে, তখন বাড়তি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। এজন্য দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সুবিধার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, সোলার প্যানেল আমদানিতে আগে যে ৬৪ শতাংশ শুল্ক ছিল, তা কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তাহমিলুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে হলে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সূর্যের আলো, বাতাস ও পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। এতে একদিকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
কর্মশালায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। তাহমিলুর রহমান বলেন, ময়মনসিংহ বিভাগ দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতিপ্রবণ অঞ্চলগুলোর অন্যতম। এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে হবে।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এভাবে ময়মনসিংহে প্রায় ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটে আপলোড করা প্রস্তাবিত মডেল অনুসরণ করে ময়মনসিংহের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
কর্মশালায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে ভবন মালিকদের সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাহমিলুর রহমান বলেন, বিল্ডিং কোড ও বিদ্যুৎ বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী নির্ধারিত ক্ষেত্রে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন না করলে ২০২৮ সাল থেকে সিটি করপোরেশন এলাকায় হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার উপায় নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে।
কর্মশালায় অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোসাম্মাৎ জোহরা খাতুন।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) রেজা মোহাম্মদ গোলাম মাসুম প্রধান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক লুতফুন নাহারসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, স্টেকহোল্ডার ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।