
গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা-এ ফুচকা খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই কিশোরের মধ্যে সামান্য কথাকাটাকাটি থেকে শুরু হওয়া বিরোধ ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ২০টি বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে একটি বিয়েবাড়িতে হামলা চালিয়ে রান্না করা খাবার, আসবাবপত্র ও অতিথিদের বসার ব্যবস্থা তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়ন-এর চরআলগী গ্রামে ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, ঈদের দিন বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের মরিচারচর এলাকায় ঈদ উপলক্ষে মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। সেখানে অস্থায়ী ফুচকা ও বিভিন্ন খাবারের দোকানে ছিল উপচেপড়া ভিড়। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন কিশোর ফুচকা অর্ডার দিলে ভুলবশত অন্য একটি দলকে আগে খাবার পরিবেশন করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে বিষয়টি তর্কাতর্কির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। পরে উভয় পক্ষের আরও লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়।
সংঘর্ষের সময় স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন মরিচারচর গ্রামের মৃত চান মিয়ার ছেলে মো. ইব্রাহিম মিয়া। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। কিন্তু পরে রাতে তাকে উচাখিলা বাজারে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে একদল লোক হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
ইব্রাহিম মিয়ার ওপর হামলার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। এর জের ধরে রবিবার (৩১ মে) দুপুরে তার সমর্থক ও স্বজনদের একটি দল চরআলগী গ্রামে গিয়ে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলাকারীরা বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি মূল্যবান মালামাল লুটপাট করে। এছাড়া প্রায় শতাধিক খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। আগুনে বহু কৃষকের খড় ও গবাদিপশুর খাদ্য পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হামলার সময় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে যান। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
এদিকে একই সময়ে চরআলগী গ্রামের হতদরিদ্র নাজিম উদ্দিনের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানেও হামলার ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বিয়ের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল এবং বরযাত্রী আসার অপেক্ষা চলছিল। এমন সময় সংঘর্ষে জড়িত একদল লোক বিয়েবাড়িতে ঢুকে রান্না করা খাবার নষ্ট করে দেয়। অতিথিদের জন্য তৈরি করা প্যান্ডেল, চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এতে মুহূর্তেই পুরো আয়োজন ভেঙে পড়ে।
নাজিম উদ্দিনের ভাই আলাল উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা গরিব মানুষ। মেয়ের বিয়ে নিয়ে অনেক কষ্ট করে আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু বিনা কারণে সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ভাই এই ঘটনা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বর আসার আগেই বিয়ের সব প্রস্তুতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেন, একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা সমাজের জন্য অশনিসংকেত। বিশেষ করে একটি দরিদ্র পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
খবর পেয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানা-র পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আযম বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের আশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।