
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের সমকালীন ইসলামি অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তিনি একাধারে ইসলামি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক, অনুবাদক, সমাজসংস্কারক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত একজন সংগঠক। দীর্ঘ কয়েক দশকের কর্মময় জীবনে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর অবস্থান তাঁকে যেমন প্রশংসা এনে দিয়েছে, তেমনি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ১৯৫০ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা) পাকুন্দিয়া উপজেলার হিজলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার বেলংকা গ্রামে।
তাঁর পিতা আব্দুর রশীদ ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক এবং মাতা সৈয়দা জেবুন্নেসা ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও স্নেহশীলা নারী। পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশ, নৈতিক শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার আবহেই তাঁর ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা ও তিন পুত্রের জনক। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সদরুদ্দীন মাকনুন, জুনুদ উদ্দীন মাকতুব এবং যারওয়াত উদ্দীন সামনুন উল্লেখযোগ্য।
উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার জন্য তিনি ভারতের বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। কঠোর অধ্যবসায় ও অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে ১৯৭৬ সালে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এই কৃতিত্ব তাঁকে তৎকালীন উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
দেশে ফিরে তিনি ইসলামি শিক্ষা বিস্তার ও সমাজগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের গ্র্যান্ড ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।
ঈদের জামাতে তাঁর জ্ঞানগর্ভ খুতবা, যুক্তিনির্ভর বক্তব্য এবং সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা তাঁকে সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত সমাজ এবং আলেম-ওলামাদের একটি বড় অংশের কাছে সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
তিনি বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার সভাপতি, জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের সভাপতি এবং ইকরা বাংলাদেশের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে দাওরায়ে হাদিস সনদকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের সমমানের সরকারি স্বীকৃতি অর্জনের প্রক্রিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষা সংস্কার ও কওমি শিক্ষাকে মূলধারার সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে আলোচিত।
জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবস্থান স্পষ্ট করতে তিনি ২০১৬ সালে এক লক্ষ এক হাজারেরও বেশি আলেম, মুফতি ও নারী আলেমের যৌথ স্বাক্ষরে ঐতিহাসিক “মানবকল্যাণে শান্তির ফতোয়া” প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
এই ফতোয়ায় ইসলামকে শান্তি, মানবতা, সহাবস্থান ও সহনশীলতার ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং সন্ত্রাসবাদকে ইসলামের পরিপন্থী ঘোষণা করা হয়। দেশ-বিদেশে এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে।
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ একজন প্রখ্যাত লেখক ও অনুবাদক হিসেবেও পরিচিত। ইসলামি জীবনব্যবস্থা, আত্মশুদ্ধি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শ্রমিকের অধিকার, নৈতিক শিক্ষা এবং সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হৃদয় জগৎ’, ‘মিম্বার থেকে বলছি’, ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণাধর্মী গ্রন্থ এবং শ্রমিকের অধিকার নিয়ে রচিত বই।
এছাড়া দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে তিনি প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার একটি বিস্তৃত সীরাতগ্রন্থ রচনা সম্পন্ন করেছেন, যা তাঁর গবেষণামনস্কতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে তিনি ‘লাজনাতুত তলাবা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কওমি অঙ্গনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি একটি ইসলামি মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন, যা নতুন প্রজন্মের আলেমদের বাংলা ভাষায় লেখালেখি ও গবেষণায় উৎসাহিত করে আসছে।
শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, মানবসেবামূলক কাজেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলাহুল মুসলিমিন পরিষদ বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনামূল্যে টিউবওয়েল স্থাপন, চিকিৎসাসেবা, ত্রাণ বিতরণ, যৌতুকবিহীন গণবিবাহ, দরিদ্র পরিবারের জন্য সেলাই মেশিন, ছাগল এবং জীবিকাসহায়ক উপকরণ বিতরণসহ নানা সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তাঁর নেতৃত্বে সংস্থাটি অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়।
ইসলামি গবেষণা, সমসাময়িক সমস্যা এবং শরিয়াহভিত্তিক সমাধান অনুসন্ধানের লক্ষ্যে তিনি ‘ইসলামিক রিসার্চ কাউন্সিল অব বাংলাদেশ’সহ একাধিক গবেষণা ও চিন্তাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।
তিনি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করেন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নারীর অধিকার বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক নানা ইস্যুতে তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থান তাঁকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। বিশেষ করে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে তাঁর বক্তব্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে মতপ্রকাশের কারণে তিনি একদিকে উদারপন্থী মহল ও সাধারণ মানুষের একটি অংশের প্রশংসা অর্জন করেন, অন্যদিকে আলেম সমাজের একটি অংশের সমালোচনারও মুখোমুখি হন।
তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ইসলামকে শান্তি, মানবতা ও সহনশীলতার আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান প্রচলিত ধর্মীয় ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ফলে তাঁর কর্মজীবন জুড়ে প্রশংসা ও বিতর্ক দুই-ই সমান্তরালভাবে বিদ্যমান ছিল।
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে, একজন আলেম কেবল মসজিদ বা মাদ্রাসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেন না; তিনি শিক্ষা, গবেষণা, সমাজসংস্কার, মানবকল্যাণ এবং জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সহিষ্ণুতা, গবেষণামনস্কতা এবং মানবসেবার সমন্বয়ে তিনি বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনে এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন অবস্থান ও মতামত তাঁকে সমকালীন সময়ের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ইসলামি ব্যক্তিত্বেও পরিণত করেছে। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা, মূল্যায়ন এবং গবেষণা এখনও অব্যাহত রয়েছে।