
সরকারি খাস জমি দখল, পুকুর ভরাট ও কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ সাবেক চেয়ারম্যান সোলাইমান কবির মাস্টারের বিরুদ্ধে
গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি :
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার কোতোয়ালী মডেল থানাধীন ৪নং পরানগঞ্জ ইউনিয়নের পরানগঞ্জ বাজার মোড়ে সরকারি খাস জমি দখল, পুকুর ভরাট এবং কোটি টাকার জমি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সোলাইমান কবির মাস্টারের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকা এই নেতা বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে বিএনপির নাম ব্যবহার করে এলাকায় নতুন করে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করে সরকারি সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, পরানগঞ্জ বাজারসংলগ্ন সংশ্লিষ্ট মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত প্রায় ৮৬ শতাংশ সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরেই দখলকে কেন্দ্র করে আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সোলাইমান কবির মাস্টার ওই জমির মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশের মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। আদালত সেই নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে রায় প্রদান করলেও পরবর্তীতে কৌশলে পুরো ৮৬ শতাংশ সরকারি জমিই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন তিনি।
বর্তমানে বাজারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত ওই জমি প্রতি শতাংশ প্রায় ২২ লাখ টাকা দরে বিক্রির গোপন বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, সরকারি জমি ব্যক্তিগত মালিকানা হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে দখলকৃত জমির একাংশে থাকা একটি পুরাতন পুকুর রাতের আঁধারে বালু ফেলে ভরাট করার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণ আইনের তোয়াক্কা না করেই দ্রুতগতিতে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। এ ঘটনায় সোলাইমান কবিরের চাচাতো ভাই রফিকুল ইসলাম ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
পরে আদালত বিবাদমান জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং পুকুর ভরাট কার্যক্রম বন্ধে ১৪৪ ধারা জারি করেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের সেই নির্দেশনাও প্রকাশ্যে উপেক্ষা করা হচ্ছে। রাতের বেলা ট্রাকভর্তি বালু এনে পুকুরে ফেলা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই দখল ও ভরাট কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) হুমায়ুন কবিরের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সব জানি, সোলাইমান কবিরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সরকারি জায়গা ভরাট করলে সমস্যা নেই, ভরাট শেষ হলে দেখা যাবে।
দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সচেতন মহলের ভাষ্য, এ ধরনের মন্তব্য দখলদারদের আরও উৎসাহিত করছে এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন সোলাইমান কবির মাস্টার। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি দ্রুত অবস্থান বদলে বিএনপির পরিচয় ব্যবহার শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর ভাষায়, “গিরগিটির মতো রং বদলে” তিনি এখন নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আগের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও সরকারি জমি দখল, প্রভাব বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ থেকে তিনি বের হতে পারেননি। বরং নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
পরানগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে বাজারসংলগ্ন কোটি টাকার সরকারি জমি স্থায়ীভাবে বেহাত হয়ে যেতে পারে। তারা অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে সোলাইমান কবির মাস্টারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে সরকারি জমি দখল, আদালতের আদেশ অমান্য এবং প্রভাব খাটিয়ে জমি বাণিজ্যের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।