
জলাবদ্ধতা নিরসনে পানিতে নেমে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল পরিষ্কার, অংশ নিলেন শতাধিক এলাকাবাসী
গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ। নিজেই পানিতে নেমে পঙ্গুয়াই খালের কচুরিপানা পরিষ্কার করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলার কাকনী ইউনিয়নের পঙ্গুয়াই খালে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। সংসদ সদস্যকে সরাসরি পানিতে নেমে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়। পরে শতাধিক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খালে নেমে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাকনী ইউনিয়নের ডিমুর বিলের পানি দীর্ঘদিন ধরে পঙ্গুয়াই খাল হয়ে কাকনী খালের দিকে প্রবাহিত হয়ে দিয়ারা নদীতে গিয়ে পড়ত। এ পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভর করেই ওই এলাকার কৃষিজমি ও বসতবাড়ির পানি নিষ্কাশন হতো। তবে কাকনী খালের সম্মুখভাগে কিছু জমি নিজেদের দাবি করে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি পানি চলাচলের পথ আটকে দেওয়ায় প্রায় সাত-আট বছর ধরে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ রয়েছে।
পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পঙ্গুয়াই খালের বিভিন্ন অংশে বিপুল পরিমাণ কচুরিপানা জমে যায়। একপর্যায়ে খালটি প্রায় অচল হয়ে পড়ায় ডিমুর বিলসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে দুয়াই, বরুয়াই, তিলাটিয়া, পারতলা, দন্তা, তিতপুর, সুতিয়াপয়ারী, মাটিচাপুর ও কাকনী, এই ৯টি গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার কারণে শত শত একর কৃষিজমি পানির নিচে পড়ে থাকায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় সময়মতো পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বাড়িঘরের চারপাশে পানি জমে থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বেড়ে যায়।
পঙ্গুয়াই গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে আমাদের এলাকার শত শত একর ফসলি জমি দীর্ঘদিন পানির নিচে পড়ে থাকত। এতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সংসদ সদস্য নিজে পানিতে নেমে কচুরিপানা পরিষ্কার করায় আমরা আশাবাদী, এবার হয়তো দীর্ঘদিনের এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, কচুরিপানা পরিষ্কার করার পর ইতোমধ্যে আশপাশের জমি ও বিলের পানি খালের দিকে নামতে শুরু করেছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
একই গ্রামের মোশাররফ হোসেন বলেন, শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। খালটি কাকনী ব্রিজ পর্যন্ত খনন করে পানিপ্রবাহের স্থায়ী ব্যবস্থা করা গেলে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে। তিনি জানান, জলাবদ্ধতার বিষয়টি সংসদ সদস্যকে জানানো হলে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বুধবার তিনি সরেজমিনে এসে নিজে খালে নেমে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এ সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ। তিনি খালের বর্তমান অবস্থা পরিদর্শন করে দ্রুত পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ বলেন, একসময় দেশের কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি ছিল খাল-বিল ও জলাশয়। কিন্তু দখল, ভরাট এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় দেশের অনেক খাল নাব্যতা হারিয়েছে। কচুরিপানার স্তূপ জমে অনেক খাল এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে শুধু জলাবদ্ধতা নয়, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু সরকারি বরাদ্দ কিংবা অনুদানের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খালগুলো সচল করা সম্ভব। জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে কম সময়ে অনেক বড় কাজ করা যায়। পঙ্গুয়াই খালের কচুরিপানা পরিষ্কার করার এই উদ্যোগও তারই একটি উদাহরণ।
এ সময় গ্রামবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ খালের শেষ প্রান্তে সৃষ্ট ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বাধা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, প্রয়োজন হলে ওই জমি তিনি নিজে কিনে নেবেন এবং খালটি কাকনী ব্রিজ পর্যন্ত খনন করে কাকনী বিলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেবেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পানিবন্দিত্বের অবসান ঘটিয়ে খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
সংসদ সদস্যের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, শুধু সাময়িকভাবে কচুরিপানা পরিষ্কার নয়, পঙ্গুয়াই খালটি স্থায়ীভাবে খনন ও পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা উপকৃত হবেন এবং এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ফিরে আসবে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের এমন উদ্যোগ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। খাল দখল ও ভরাটমুক্ত রেখে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও খনন কার্যক্রম চালু রাখা গেলে পঙ্গুয়াই খালটি আবারও এলাকার কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।