
গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী মো. ছোয়াইবকে দুই দফা বদলি ও পরে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলেও তিনি এখনো দায়িত্ব ছাড়েননি। দাপ্তরিক নির্দেশনা অমান্য করে তিনি আঞ্চলিক কার্যালয়ে অবস্থান করায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে বদলির আদেশ কার্যকরের মধ্যবর্তী সময়ে তার করা একাধিক বদলিকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল কাজী মো. ছোয়াইবকে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরে ৯ এপ্রিল আরেক নির্দেশনায় তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে ছাড়পত্র গ্রহণের কথা বলা হয়। কিন্তু ওই নির্দেশনা কার্যকর না করে তিনি ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়েই অবস্থান করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ১৯ এপ্রিল হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তর থেকে নতুন আদেশে তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, বদলির পরও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থান করা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল। একই আদেশে তাকে ২০ এপ্রিল সকাল ১০টার মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়। আদেশে স্বাক্ষর করেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা।
একই সময়ে পৃথক আদেশে গাজীপুর অঞ্চলের এসপি মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের চিঠি দিলেও এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও আঞ্চলিক কার্যালয়ে বসতে পারেননি।
মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ভদ্রতার কারণেই আমি সরাসরি সেখানে গিয়ে বসছি না। তিনি আমার জুনিয়র কর্মকর্তা। কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, সেটা চাই না। তবে দাপ্তরিক কার্যক্রম আমি চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, অফিসার ও ফোর্সের বেতন-ভাতা আটকে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। পরে আমার স্বাক্ষরে বেতন দেওয়া হয়েছে। তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার পরও কেন অফিস ছাড়ছেন না, সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
হাইওয়ে পুলিশের ময়মনসিংহ অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার রণজয় চন্দ্র মল্লিক বলেন, কাজী মো. ছোয়াইব এখনো দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। অপারেশনাল কাজগুলো রহমত উল্লাহ স্যার পরিচালনা করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। সদর দপ্তর থেকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে, তার কোনো নির্দেশনা যেন অনুসরণ না করা হয়।
এদিকে বদলির আদেশ কার্যকরের সময়ের মধ্যেই কাজী মো. ছোয়াইবের করা বিপুলসংখ্যক বদলিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত মাত্র ৩২ দিনে ১৬টি পৃথক চিঠির মাধ্যমে মোট ৭৭ জন পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ৯ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৯ জন এবং ২৬ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত আরও ৩৮ জন সদস্যকে বদলি করা হয়।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীনে ভরাডোবা, শ্যামগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, কটিয়াদী ও নান্দাইল থানায় মোট ১৭৭ জন সদস্য কর্মরত আছেন। পুরো অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন একজন এসপি ও একজন এএসপি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বদলি হওয়া এক কনস্টেবল বলেন, এভাবে ঘন ঘন বদলি হলে পরিবার নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ সদস্যদের অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও স্থিরভাবে দায়িত্ব পালন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাজী মো. ছোয়াইব। তিনি বলেন, “আমাকে যেখানে বদলি করা হয়েছে, সেখানে আমি আগেও চার বছর দায়িত্ব পালন করেছি। তাই পুনর্বিবেচনার জন্য স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপির কাছে আবেদন করেছি। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় আমি এখানে আছি। মৌখিকভাবে এখানেই থাকতে বলা হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, কর্মীদের আবেদনের ভিত্তিতেই বদলিগুলো করা হয়েছে। অনেকে নতুন যোগ দিয়েছেন, আবার অনেকে প্রয়োজন বিবেচনায় বদলির আবেদন করেছিলেন।
বেতন-ভাতা বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, সময়সীমার মধ্যেই বেতনের কাগজপত্র অ্যাকাউন্টস অফিসে পাঠানো হয়েছিল। পরে কেন বিলম্ব হয়েছে, তা আমার জানা নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে অফিস পরিচালনায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানিয়েছেন, কাজী মো. ছোয়াইবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, তাকে বদলি ও পরে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলেও তিনি আদেশ মানেননি। বর্তমানে তিনি কার্যত কার্যালয় দখল করে রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বদলির আদেশের পর তিনি যেসব বদলি করেছেন, সেগুলো কার্যকর হবে না।
ঘটনাটি নিয়ে হাইওয়ে পুলিশের অভ্যন্তরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য এবং দায়িত্ব হস্তান্তর জটিলতায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।