
চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায় মদদ, ফুটপাত থেকে উৎকোচ গ্রহণ ও অপরাধীদের প্রশাসনিক সহায়তার অভিযোগ; তদন্ত চায় সচেতন মহল।
গোলাম কিবরিয়া পলাশ ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহ নগরীর কোতোয়ালি মডেল থানাধীন ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মাহবুব মিলকীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ, ফুটপাত ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় এবং অপরাধীদের প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ফাঁড়ির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কঠোর ভূমিকার পরিবর্তে একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে নানা অনিয়ম পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুটপাতের ব্যবসা, আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নিয়মিতভাবে অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ফাঁড়ির আশপাশের কিছু এলাকায় মাদক ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, স্থানীয় কিছু কথিত অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি, আবার কেউ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বা মানহানিকর তথ্য প্রচারের মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, একটি চক্র প্রথমে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক পরিচয় বা প্রভাব দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে অনলাইনে অপপ্রচার চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো অপরাধী চক্রের সদস্য চাঁদাবাজি কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সুবিধা আদায় করার পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলে ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়েন। এতে অনেকেই পুলিশ বা আদালতের কাছে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার প্রশাসনিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং অনেক অভিযোগ প্রকাশ্যে আনতেও ভয় পাচ্ছেন।
মাদক ব্যবসা নিয়েও ইনচার্জ মাহবুব মিলকীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কেউ কেউ পুলিশের সোর্স পরিচয়ে চলাফেরা করেন। এসব ব্যক্তির মাধ্যমে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি মাদকের চালান আটক হওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি বা আদালতস্বীকৃত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মাহবুব মিলকী দীর্ঘদিন ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। সাবেক ডিবি কর্মকর্তা হারুন ও ডিআইজি নূরুল ইসলামসহ তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থানীয় একটি মহল আরও অভিযোগ করছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ও বৈঠকের মাধ্যমে একটি পক্ষ এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এ ধরনের অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে যখন চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায় মদদ, অপরাধীদের সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা তা বের করতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় নাগরিকরা দাবি করেছেন, ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মাহবুব মিলকীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা, উৎকোচ গ্রহণ, অপরাধীদের সহায়তা এবং অনলাইনভিত্তিক হয়রানির অভিযোগগুলো আলাদাভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাসহ পুরো চক্রের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করা উচিত, যাতে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভাবমূর্তি অযথা ক্ষুণ্ন না হয়।